দেশের মোটরসাইকেলের বাজারে ২০২২ সালের পর থেকেই মন্দা ভাব বিরাজ করছে। দুই চাকার বাহনটি বিক্রি ও নিবন্ধনে পরপর দুই বছর নিম্নমুখী প্রবণতায় থাকার পর ২০২৫ সালে কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য বলছে, গত বছর সারা দেশে ২ লাখ ৮৯ হাজার ৮৩০টি মোটরসাইকেল নিবন্ধিত হয়েছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ১০ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে দেশে মোটরসাইকেল উৎপাদক ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাবে গত বছর দেশে প্রায় সাড়ে চার লাখ মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে। বাহনটির বিক্রিতে প্রবৃদ্ধির হার ২০ শতাংশের বেশি।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চ সিসি এবং উচ্চপ্রযুক্তির মোটরসাইকেলের চাহিদা অনেক বেড়েছে। এ চাহিদায় ভর করে দেশে মোটরসাইকেলের বাজার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন তারা। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে এ চাহিদা আরো বাড়বে বলে প্রত্যাশা করছেন তারা।
ব্যবসায়ীরা সামনের দিনগুলোতে মোটরসাইকেলের চাহিদা বৃদ্ধির প্রত্যাশা করলেও পরিবহন বিশেষজ্ঞরা দেশে বাহনটির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিতে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। তারা বলছেন, চালকদের অদক্ষতা, আইন না মানার প্রবণতা, মানহীন হেলমেট ব্যবহার, বেপরোয়া মনোভাব পরিবহন ব্যবস্থায় যেমন বিশৃঙ্খলা বাড়িয়ে দিচ্ছে, তেমনি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির কারণ হচ্ছে। সড়কে মৃত্যুর অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৭১ জন নিহত হয়েছেন, যা সড়কে মোট মৃত্যুর ৩৬ শতাংশের বেশি।
বিআরটিএ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশে এ-যাবৎকালের মধ্যে এক বছরে সর্বোচ্চ মোটরসাইকেল নিবন্ধিত হয়েছিল ২০২২ সালে। ওই বছর সারা দেশে পাঁচ লাখের বেশি মোটরসাইকেল নিবন্ধন দেয় সংস্থাটি। যদিও এরপর ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে নিবন্ধন। ২০২৩ সালে বিআরটিএ থেকে নিবন্ধন পায় ৩ লাখ ১০ হাজারের বেশি মোটরসাইকেল। ২০২৪ সালে তা আরো কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৬২ হাজার ৭১৫টিতে।
দেশের মোটরসাইকেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৩ সালে দেশের অর্থনৈতিক সংকট এবং ২০২৪ সালে রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিবেশ মোটরসাইকেল বিক্রিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। আবার এ সময়ে কম দামের মোটরসাইকেলের বদলে বাজারে উচ্চ দাম ও উন্নত প্রযুক্তির মোটরসাইকেলের চাহিদা বেড়ে যায়। এ কারণে ইউনিট হিসেবে মোটরসাইকেলের বিক্রি কমলেও টাকার অংকে বাহনটির বাজার প্রসারিত হয়েছে। ২০২৫ সালেও এ ধারা অব্যাহত আছে এবং এর সঙ্গে মোটরসাইকেল বিক্রিতেও প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
এ সম্পর্কে জানতে টিভিএস অটোস বাংলাদেশ লিমিটেডের সিইও বিপ্লব কুমার রায় বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে মোটরসাইকেলের বাজার “স্লো ডাউন” থেকে একটু ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু বাজারটি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য দেশে স্থিতিশীল অবস্থা থাকা জরুরি।’
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণাসহ বিভিন্ন কাজে মোটরসাইকেল ব্যবহারের একটা প্রবণতা দেখা যায়। গত বছর দেশে মোটরসাইকেল বিক্রি বেশি হওয়ার পেছনে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কোনো প্রভাব আছে কিনা, এমন প্রশ্নে বিপ্লব কুমার রায় বলেন, ‘বাজারে যখন টাকার প্রবাহ বাড়ে, তখন সাধারণত মোটরসাইকেলের মতো পণ্যের বিক্রি বেড়ে যায়। নির্বাচনের সময় টাকার প্রবাহ বেশি দেখা যায়। এ কারণে এ সময়ে মোটরসাইকেলের বিক্রি কিছুটা বেশি হলেও হতে পারে। তবে কারণটি মোটরসাইকেলের সামগ্রিক বেচাকেনায় খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না।’
দেশে মোটরসাইকেলের বিক্রি যেমন বাড়ছে, তেমনি বাহনটির মোট সংখ্যা এবং দুর্ঘটনা ও প্রাণহানিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিআরটিএর হিসাব বলছে, দেশে বর্তমানে সব মিলিয়ে মোটরযান রয়েছে প্রায় ৬৬ লাখ। এর মধ্যে মোটরসাইকেলের সংখ্যাই ৪৮ লাখ ৭০ হাজারের বেশি। ক্রমবর্ধমান মোটরসাইকেল দেশের সড়ক পরিবহন খাতে দুর্ঘটনা ও বিশৃঙ্খলার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেড়েছে ৯ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং প্রাণহানি বেড়েছে ২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। গত বছর মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে ৩ হাজার ২৯টি, নিহত হয়েছেন ২ হাজার ৬৭১ এবং আহত ২ হাজার ২৭ জন। নিহতদের মধ্যে ১ হাজার ৮৯২ জন ১৪ থেকে ৪৫ বছর বয়সী।
সংগঠনটির হিসাবে, দেশে মোট মোটরযানের ৭১ শতাংশ মোটরসাইকেল। মোটরসাইকেলচালকদের বিরাট অংশ কিশোর ও যুবক। এরা বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালিয়ে নিজেরা দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হচ্ছে এবং অন্যদের আক্রান্ত করছে। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার একটি বড় অংশ ঘটছে বাস ও পণ্যবাহী ভারী যানবাহনের ধাক্কা বা চাপায়। বেপরোয়া যানবাহনের কারণে দক্ষ মোটরসাইকেল চালকরাও দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন।
দেশে গত কয়েক বছর মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ও হতাহতের ঘটনা বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গেছে। এজন্য বাহনটির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়াকে দায়ী করছেন সড়ক দুর্ঘটনা বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, মোটরসাইকেলের সংখ্যা যত বেশি হবে, বাহনটিতে দুর্ঘটনার সংখ্যাও তত বাড়বে এটা দেশে দেশে পরীক্ষিত। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. সামছুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের সড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার জন্য বর্তমানে বড় হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে মোটরসাইকেল। পৃথিবীর অনেক দেশই এখন মোটরসাইকেল ব্যবহার সীমিত করে ফেলছে। বাংলাদেশেরও সে পথে অগ্রসর হওয়া উচিত।’